শিক্ষকতা পেশাকে আর মহিমান্বিত করবেন না
আজ শিক্ষক দিবসের এই দিনে, যখন প্রায় সারা চীন শিক্ষকের প্রতি উপহার আর প্রশংসার বন্যায় ভাসছে, ঠিক তখনই আমাকে একটু উল্টো কথা বলার অনুমতি দিন।
রাজনৈতিকভাবে হয়তো কথাটা ঠিক নয়, কিন্তু শিক্ষকতাও তো আর দশটা পেশার মতোই একটা কাজ। এখানেও টাকা নিয়ে কাজ করা হয়। তাহলে কেন শুধু এই পেশার মানুষকেই বিশেষভাবে সম্মান দেখাতে হবে?
ভালো শিক্ষক, যাঁরা মন দিয়ে পড়াতে পারেন, তাঁদের দেখেছি। আবার বাজে শিক্ষকও দেখেছি। কিন্তু এমন কোনো শিক্ষক আমার জীবনে আসেননি যিনি আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন বা আমার জীবনকে বদলে দিয়েছেন। ক্লাস নেওয়া একজন শিক্ষকের কর্তব্য। ভালো ক্লাস নেওয়া তাঁদের পেশাদারিত্বের পরিচয় হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি পেশাতেই তো এমন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ আছেন। তাহলে কেন শুধু শিক্ষকদেরই বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে?
আজকাল শিক্ষকতা পেশায় আসার জন্য যোগ্যতা বা মানদণ্ড অনেকটাই শিথিল। আমি যখন স্কুলে পড়তাম, দেখতাম পাশের ক্লাসের অনেক ছাত্র-ছাত্রী অন্যের খাতা দেখে টুকে নিতো, প্রায়ই ক্লাস ফাঁকি দিতো, এমনকি ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলতে পারতো না। ভাবতেই অবাক লাগে যে তাদের অনেকেই হয়তো একদিন শিক্ষক হবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কাজ করতে হয় অপরিণত মনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে। আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় ‘মানুষ গড়া’র ব্যাপারটা আর নেই বললেই চলে, শুধু পড়াতে পারলেই হলো। তার ওপর অনেক শিক্ষক তো ঠিকমতো পড়াতেও পারেন না। আর একজন বাজে শিক্ষক তো একটা শিশুর সারাটা জীবন নষ্ট করে দিতে পারেন।
শিক্ষকরা যতই বলুন না কেন, পক্ষপাতিত্ব তো হবেই। এত ছাত্রছাত্রীর ভিড়ে শিক্ষকের বিশেষ মনোযোগ পায় মূলত ভালো ছাত্রছাত্রীরা আর দুর্বল ছাত্রছাত্রীরা। আর এর ভেতরেই দুর্নীতির জন্ম হয় সবচেয়ে বেশি। শিক্ষকদের উপহার দেওয়া, টাকা ভর্তি খাম ধরিয়ে দেওয়া, অথবা প্রাইভেট পড়ানোর জন্য অনুরোধ করা — এমন অভিভাবকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এমনকি এমনও শুনেছি যে, কিছু স্কুলের শিক্ষকরা নাকি অভিভাবকদের কাছ থেকে প্রকাশ্যেই টাকা ভর্তি খাম নেন এবং সেই খামের টাকার পরিমাণ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগ দেন। এসব শুনে চোখ খুলে যায়।
শিক্ষকদের প্রতি এই যে অন্ধ স্তুতি আর মহিমান্বিত করার প্রবণতা, এটা আর কী কী সমস্যা ডেকে আনতে পারে? এর ফলে অপরিণত মনের শিশু/তার অভিভাবকরা একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে মাত্রাতিরিক্ত বিশ্বাস করে ফেলে। তাদের চোখে শিক্ষক যেন বাবা-মায়ের চেয়েও পবিত্র এক সত্তা হয়ে ওঠেন – বাবা-মায়ের কথা হয়তো না শুনলেও শিক্ষকের কথা তারা অবশ্যই শুনবে। কিন্তু কেউ কি কখনো হিসেব করে দেখেছে যে শিক্ষকদের মধ্যে কতজন শিশু-যৌন নিপীড়ক লুকিয়ে আছে? যৌন শিক্ষার অভাবে ভোগা চীনে প্রতিদিন কত ‘ফাং সি-চি’র মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে চলেছে?
আমি যখন ক্লাস সিক্স-এ পড়তাম, আমাদের একজন শিক্ষিকা সন্তান প্রসবের জন্য ছুটিতে গেলে, অন্য এক প্রদেশের একজন মধ্যবয়সী পুরুষ শিক্ষক আমাদের ক্লাসে বদলি হয়ে এলেন। ক্লাসে দুষ্টু ছাত্রদের তিনি প্রায়ই বকাঝকা করতেন, বলতেন, ‘আমাদের ওখানে হলে তো আমি কবেই এক লাথি মেরে তাড়িয়ে দিতাম!’ এর পাশাপাশি তিনি ছোট মেয়েদের হাত ধরে ধরে অঙ্ক বোঝাতেন। আমার মনে নেই আমাকে তিনি ছুঁয়েছিলেন কিনা (আমি তাঁর পছন্দের ছাত্রীদের মধ্যে ছিলাম না), কিন্তু তখন আমরা কেউই কিছু বুঝতাম না। বড়জোর নিজেদের মধ্যে একটু হাসাহাসি করতাম, কিন্তু এই আচরণকে গুরুতর কিছু বা যৌন হয়রানি বলে ভাবতামই না। এখন যখন ভাবি, তখন খুব ঘেন্না লাগে।
অপ্রাপ্তবয়স্কদের কথা ছেড়েই দিন, প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হন, যেখানে শিক্ষকরা নিজেদের পদমর্যাদার সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন পরীক্ষার ফলাফল বা সার্টিফিকেট আটকে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে, কিংবা তাদের দিয়ে বিনা পয়সায় কাজ করিয়ে নেন। তবে ক্ষমতার এই লাগামহীন ব্যবহার শুধু শিক্ষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষমতা অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি করার প্রবণতা চীনের প্রায় প্রতিটি ক্ষমতাবান স্থানেই দেখা যায়, যা আমাদের দেশের একটি সাধারণ সমস্যা।
আপনি চাইলে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ধন্যবাদ জানাতে পারেন এবং তাঁর প্রশংসা করতে পারেন যিনি আপনাকে সাহায্য করেছেন। কিন্তু কোনো একটি পেশাকে নির্বিচারে মহিমান্বিত করা বা অতিরিক্ত প্রশংসা করার সত্যিই কোনো দরকার নেই।
ঠিকই বলেছেন, অবশ্যই এমন ব্যক্তি থাকতে পারেন যাঁদের অবদান অনস্বীকার্য (তবে ‘মহান ব্যক্তি’ শব্দটা ঠিক মানানসই নয়, কারণ এতে ‘দেবতা বানানোর’ প্রবণতা দেখা যায়), কিন্তু কোনো পেশাই নিজে থেকে ‘মহান’ হতে পারে না।